নিজস্ব প্রতিনিধি –
যাদবপুরের ঐতিহ্যবাহী ইন্দুমতী সভাগৃহ ১ লা আগস্ট
অনুষ্ঠিত হয়েছিল সুর, তাল, লয় ও নৃত্যকলার এক অপরূপ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নবপ্রজন্মের শিল্পসাধনাকে শাণিত করে শাস্ত্রীয় ও আধুনিক সঙ্গীতচর্চার ধারাকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যয়ে ‘রেওয়াজ’ সঙ্গীত শিক্ষা কেন্দ্রের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হলো তাদের প্রথম সাংস্কৃতিক নিবেদন ‘প্রথম প্রয়াস’। সুপরিকল্পিত পরিবেশনা, নান্দনিক উপস্থাপনা এবং শিল্পমানের উৎকর্ষে সমগ্র অনুষ্ঠানটি এক অনন্য সাংস্কৃতিক মহোৎসবে পরিণত হয়, যা উপস্থিত সংস্কৃতিপ্রেমী দর্শকদের হৃদয়ে গভীর অনুরণন সৃষ্টি করে।
অনুষ্ঠানের সূচনালগ্ন থেকেই সভাগৃহে বিরাজ করছিল এক স্নিগ্ধ, সৌকর্যমণ্ডিত ও শিল্পভাবনায় পরিপূর্ণ আবহ। সুরের আরাধনা, নৃত্যের অভিব্যক্তি এবং সাহিত্যনির্ভর সঙ্গীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে বাংলার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক মনোজ্ঞ প্রতিফলন প্রত্যক্ষ করেন উপস্থিত অতিথি, অভিভাবক, শিল্পী ও দর্শকবৃন্দ। প্রতিটি পরিবেশনাই ছিল দীর্ঘ সাধনা, শৈল্পিক শৃঙ্খলা এবং নিষ্ঠার এক উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ।
চারটি সুচিন্তিত ও সুসংগঠিত পর্বে বিন্যস্ত এই মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার শুভসূচনা হয় ‘রেওয়াজ’-এর নবীন শিক্ষার্থীদের পরিবেশিত এক মনোমুগ্ধকর সঙ্গীত আলেখ্য দিয়ে। তাঁদের সুরেলা কণ্ঠ, তাল-লয়ের শৃঙ্খলাবদ্ধ উপস্থাপনা এবং আত্মবিশ্বাসী পরিবেশনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত প্রশিক্ষণ, অধ্যবসায় ও সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয়। প্রতিটি গানের সঙ্গে দর্শকাসনে সৃষ্টি হয় আবেগ, উচ্ছ্বাস এবং অকুণ্ঠ করতালির ঢেউ।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে মঞ্চ অলংকৃত করেন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী শ্রীমতী ব্রততী বটব্যাল। তাঁর পরিশীলিত নৃত্যভাষা, অনবদ্য অঙ্গসঞ্চালন, লাবণ্যময় মুদ্রাবিন্যাস এবং অভিব্যক্তিনির্ভর পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধতার আবেশে আবিষ্ট করে তোলে। শাস্ত্রীয় নৃত্যের নান্দনিকতা ও ভাবগাম্ভীর্য তাঁর উপস্থাপনায় এক অনন্য উচ্চতায় উন্নীত হয়।
তৃতীয় পর্বে ‘রেওয়াজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার মধুমিতা সিনহা তাঁর সহশিল্পী ও বান্ধবীদের সঙ্গে পরিবেশন করেন বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ পঞ্চকবির গান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, অতুলপ্রসাদ সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় এবং রজনীকান্ত সেনের কালজয়ী সৃষ্টির সম্মিলিত পরিবেশনা সভাগৃহে এক অনির্বচনীয় আবেগঘন পরিবেশের জন্ম দেয়। সুর, সাহিত্য ও ভাবের এই অনবদ্য সমন্বয় শ্রোতৃমনে এক গভীর নান্দনিক অভিঘাত সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘক্ষণ করতালির মাধ্যমে শিল্পীদের সম্মানিত করা হয়।
অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে নৃত্যশিল্পী সৌরজা তথা রঞ্জাবতী এবং তাঁর দক্ষ নৃত্যদলের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা গোটা সন্ধ্যাকে এক অনন্য শিল্পসম্ভারে রূপান্তরিত করে। মনোহর কোরিওগ্রাফি, সুনিপুণ মুদ্রাবিন্যাস, ছন্দময় উপস্থাপনা এবং দৃষ্টিনন্দন মঞ্চসজ্জার সমন্বয়ে তাঁদের নৃত্যানুষ্ঠান দর্শকদের অভিভূত করে। সেই মনোরম পরিবেশনার মধ্য দিয়েই ‘রেওয়াজ’-এর প্রথম সাংস্কৃতিক নিবেদন সাফল্যের সঙ্গে পরিসমাপ্ত হয়।
অনুষ্ঠানের সামগ্রিক সাফল্যের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বিশিষ্ট বাদ্যযন্ত্রীবৃন্দ। কীবোর্ডে সুরজিৎ চক্রবর্তী, ভায়োলিনে অম্লান হালদার, তবলায় প্রশান্ত সেন এবং পারকাশনে সব্যসাচী মুখোপাধ্যায় তাঁদের অসাধারণ সঙ্গত ও দক্ষতায় প্রতিটি পরিবেশনাকে অনন্য মাত্রা প্রদান করেন।
তাঁদের নিখুঁত বাদ্যসমন্বয় শিল্পীদের পরিবেশনাকে আরও সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত করে তোলে।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই রেওয়াজের কনিষ্ঠ শিল্পী দৃপ্ত চক্রবর্তী র কচি কণ্ঠের ‘গ্রামছাড়া ঐ রাঙ্গা মাটির পথ’ মনের বাউল সত্তাকে জাগিয়ে তোলে। ঝরা-পাতায় ভর করে স্বপ্ন সম্ভাবনাকে জিইয়ে রাখলেন সোনালী দত্তের ‘ছিন্ন পাতায় সাজাই তরণী’ গানটি।
অসীম ঈশ্বর প্রেমের আনন্দে কচি-কাঁচারা গাইল ‘আমার সকল রসের ধারা’, রক্তকরবীর বিশু পাগলের কথা ভেবে সংবাদ পাঠিকা বৃষ্টি সেনগুপ্ত গাইলেন ‘তোমায় গান শোনাবো’, স্বপ্নলোকের উদ্দেশ্যে সমবেতভাবে ‘স্বপনপারের ডাক শুনেছি’ গানটি

পরিবেশনের পরেই ক্লান্ত জীবনে আত্মিক স্পর্শের খোঁজে সুজাতাদির কণ্ঠের ‘শুধু তোমার বাণী নয় গো’ গানটি সকলের মন ছুঁয়ে গেল। শ্রাবণ বরিষণে মিশে ‘আমার নিশীথ রাতের ও বাদল ধারা ‘ গানটি দ্বৈতকণ্ঠে গাইলেন চন্দ্রানী ও সীমা।বনফুলের গন্ধে মিশে তিতাস মুখার্জি গাইলেন ‘ওগো শোনো কে বাজায়’, জন্মান্তরবাদের কথায় অঙ্কিতা গাইলেন ‘ওদের সাথে মেলাও’।একক কণ্ঠের শেষ গান ‘ঝিমিকি ঝিমিকি ঝরে ভাদরের ধারা’ গেয়ে প্রেমের আগমনী সূচনা করলেন মিষ্টি মেয়ে রাজন্যা। সমবেত কণ্ঠে ‘নমো নমো নমো’ গানটি গেয়ে গীতি আলেখ্য শেষ হল।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সাবলীল, প্রাঞ্জল ও সৌকর্যমণ্ডিত ভঙ্গিতে সঞ্চালনা করেন শম্পা গুহ।
অপরদিকে, অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, শিল্পী নির্বাচন, মহড়া, মঞ্চ-পরিচালনা এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় মধুমিতা সিনহা-র দূরদর্শিতা, সাংগঠনিক প্রজ্ঞা ও সাংস্কৃতিক নিষ্ঠা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও শিল্পভাবনার সার্থক বাস্তবায়নেই ‘রেওয়াজ’-এর প্রথম প্রয়াস একটি স্মরণীয় সাংস্কৃতিক আয়োজনে পরিণত হয়েছে।
অনুষ্ঠানের পর ‘রেওয়াজ’ সঙ্গীত শিক্ষা কেন্দ্রের পক্ষ থেকে উপস্থিত সকল শিল্পী, বাদ্যযন্ত্রী, অভিভাবক, শুভানুধ্যায়ী, কলাকুশলী এবং সংস্কৃতিপ্রেমী দর্শকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয়। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এই প্রথম পদক্ষেপ আগামী দিনে আরও বৃহত্তর সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবে এবং ‘রেওয়াজ’ সঙ্গীত শিক্ষা কেন্দ্র সঙ্গীত, নৃত্য ও সংস্কৃতিচর্চার এক সুপ্রতিষ্ঠিত বিদ্যাপীঠ হিসেবে সমাজে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।



